আজকের চাঁপাই | আপডেট: 5:26 AM, October 15, 2026
স্কুল ফিডিংয়ের খাবারে শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ, নিম্নমানের প্রমাণেও নেই কোনো ব্যবস্থা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে দফায় দফায় স্কুল ফিডিংয়ের নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটি ও পচা ডিম খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। গত ৬ মাসে ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমপক্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছে। এদের বেশিরভাগই ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল ও শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে।
প্রত্যেকটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের পর তদন্তে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গ্রাম উন্নয়ন কর্ম-গাকের বিরুদ্ধে গাফিলতি, অনিয়ম ও নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সরবরাহের প্রমাণ পাওয়ার পরেও তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।
একের পর এক বিদ্যালয়ে অসুস্থতার ঘটনা ঘটলেও এ নিয়ে উদাসীন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসন। পেট ব্যথা, বমি ও খিঁচুনি নিয়ে প্রত্যেকবার হাসপাতালে ভর্তি হলেও খাবারের মান উন্নয়নের নেই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। প্রত্যেকবার ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন হলেও পরিবর্তন হয়নি অবস্থার। সর্বশেষ তদন্তেও মিলেছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের খাবার সরবরাহের।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিষক্রিয়া থেকেই অসুস্থতার ঘটনাগুলো ঘটেছে। এমন অবস্থায় উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও অসুস্থ শিক্ষার্থীরা।
সরকারের পাইলট প্রকল্পের আওতায় জেলার চারটি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরের টিফিন বিরতিতে শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করা হয় স্কুল ফিডিংয়ের ডিম ও পাউরুটি। এসব খাবার খেয়েই একে একে ডায়রিয়া, বমি ও পেট ব্যথা শুরু হয় শিক্ষার্থীদের। প্রত্যেকটি ঘটনায় অসুস্থ হওয়ার ধরন রোগের লক্ষণ প্রায় একই। সবখানেই স্কুল ফিডিংয়ের বনরুটি ও ডিম খাওয়ার পরই অসুস্থ হয়েছে শিক্ষার্থীরা।
অসুস্থ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, দুর্গন্ধযুক্ত ডিম ও নিম্নমানের পাউরুটি খেয়েই অসুস্থ হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এসময় তীব্র পেট ব্যথা ও বমি হওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শিশুরা।
দফায় দফায় স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ায় ঘটনায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। তাদের দাবি, খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা ও প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই বারবার নিম্নমানের পাউরুটি ও পচা ডিম খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। খাবার মান নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হওয়ার দাবি তাদের।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের স্বার্থে প্রত্যেক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গ্রাম উন্নয়ন কর্ম-গাকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তাদের। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, খাবার মান নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর তদারকি প্রয়োজন।
অভিভাবক হাসান আলী, শফিকুল ইসলাম, মাইনুল খান সময় সংবাদকে বলেন, স্কুল ফিডিং কার্যক্রমটি নিঃসন্দেহে সরকারের ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এনজিও-কে এই খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দেয়ায় বিপত্তি ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা তাদের বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ বজায় রাখতে গিয়ে নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সরবরাহ করছে। ফলে বারবার শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য বিবেচনায় অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি অসুস্থ হওয়া শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা। প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গেলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার ঘটনায় নয়াগোলা পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলামের সাথে কথা বলতে চাইলে সময় সংবাদকে তিনি জানান, অফিস থেকেই এ নিয়ে কথা বলতে মানা। দয়া করে এসব নিয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে বলবেন না। ওই ঘটনার পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে সব শিক্ষার্থী বাসায় ফিরে এসেছে।
সর্বশেষ গত ০১ অক্টোবর স্কুল ফিডিংয়ের নিম্নমানের খাবার খেয়ে শিবগঞ্জ উপজেলার লহলামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়। পরে তাদেরকে শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া। তার আগে গত ০৬ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার নয়াগোলা পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে ১১ জন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরে অসুস্থ শিক্ষার্থীদেরকে চিকিৎসার জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুপুরের টিফিন বিরতিতে শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করা হয় স্কুল ফিডিংয়ের ডিম ও পাউরুটি। এসব খাবার খেয়েই একে একে বমি ও পেট ব্যথা শুরু হয় শিক্ষার্থীদের। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির কমপক্ষে ১১ শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিংয়ের ডিম ও পাউরুটি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাদেরকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নেয়া হয় ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গাক’র সরবরাহকৃত খাবার খেয়ে ২০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনার দিনেই ভ্রাম্যমাণ আদালত গাককে ৪০ হাজার জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে সদর উপজেলার সব বিদ্যালয়ে খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এর কয়েকদিন পরই শিবগঞ্জের চাতরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয় কয়েকজন শিক্ষার্থী।
এছাড়াও গত ১৭ জুন সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের সালিম ডোলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে ১৫ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়।
এ ঘটনায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গাকের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এছাড়াও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের জন্য বনরুটি সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।
জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান মনির স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা চিন্তিত। একের পর এক ঘটনা ঘটলেও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। আমরা চাই না, আর একটি শিশু অসুস্থ হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হোক। আশা করি, স্থানীয় প্রশাসন এ নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
নয়াগোলা পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় তদন্ত শেষ করেছে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, তদন্ত নিম্নমানের পচা ডিম সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত রিপোর্টে সুস্পষ্ট করে উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হয়েছে।
উপসর্গ ও অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী খাবারে বিষক্রিয়া থেকেই অসুস্থতার কথা বলছেন চিকিৎসকরা। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার জানান, প্রত্যেকটি ঘটনায় অসুস্থ হওয়া শিক্ষার্থীদের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়ার পর শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। সবাই সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেছেন। অসুস্থদের সবার লক্ষণ প্রায় একই। সবাই পেট ব্যথা, বমি ও খিঁচুনি নিয়ে হাসপাতালে এসেছিল। এমনকি সবাই অসুস্থ হয়েছে খাবার গ্রহণের পর। তাই রোগের লক্ষণ ও খাবার গ্রহণের হিসাব অনুযায়ী তা খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে হয়েছে বলেই ধরে নেয়া যায়। শিশুদের এসব খাবার প্রদানের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।
চিকিৎসকরা বিষক্রিয়ার কথা বললেও তা মানতে নারাজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঘটনার পর নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্টে পাঠানো হয়েছিল। এতে কোনো বিষক্রিয়ার প্রমাণ মিলেনি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, তদন্তে যা পাওয়া গেছে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে অভিভাবকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যে কমিটি প্রতিদিন যাচাই-বাছাই করে খাবার গ্রহণ করবে।
এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন রিসিভ করেননি স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাম উন্নয়ন কর্ম-গাকের প্রজেক্ট ম্যানেজার ফিরোজ আহমেদকে। একবার তাকে ফোনে পেলেও তিনি জানান, এই মুহূর্তে রংপুরে রয়েছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরে যোগাযোগ করব। পরে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি।
এদিকে, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র পরিচালক মাহবুব আলম একটি সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, কয়েকটি ঘটনায় আমরাও বিব্রত। এসব ঘটনা ঘটার পরপরই আমাদের লোকবল বৃদ্ধি ও পরিবর্তন করেছি। এমনকি দুটি খাবার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেয়া হয়েছে৷ পাশাপাশি খাবার উৎপাদনের জায়গাতেও কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। শিশুদের খাদ্যের বিষয়ে আমরা আরও বেশি কঠোর ও সচেতন রয়েছি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গি জানান, তদন্তে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা আমরা বাস্তবায়ন করব। এ নিয়ে প্রশাসন অনেক বেশি কঠোর। খাবার গ্রহণের সময় আরও বেশি সর্তকতা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি জেলা-উপজেলা কর্মকর্তাদের তদারকি আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
প্রসঙ্গত, নিম্নমানের পাউরুটি ও ডিম সরবরাহের অভিযোগে খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। জেলার চারটি উপজেলার ৬১৮টি বিদ্যালয়ে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রাম উন্নয়ন কর্ম-গাক দৈনিক স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহ করে। এর আগে নিম্নমানের পাউরুটি সরবরাহ করার দায়ে দুই দফায় ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।






