আজকের চাঁপাই | আপডেট: 2:26 AM, October 25, 2026
৩০ লাখ টাকার প্রাইজমানি, আজ শুরু মাঠের লড়াই
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এবিজি স্পোর্টস সিটিতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের প্রাণের উৎসব। ফুটবল ও ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে আয়োজিত ‘এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ ২০২৬’ কেবল দুটি খেলার প্রতিযোগিতা নয়, বরং দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক ছাদের নিচে এনে পারস্পরিক বন্ধন, সৌহার্দ্য ও সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরির একটি বড় উদ্যোগ। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ঢাকার ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও প্রস্তুতি দেখা গেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহের একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে।
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অংশগ্রহণে এবারের আয়োজন পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসগুলোতে খেলাকে ঘিরে যে আবেগ ও প্রস্তুতি লক্ষ করা গেছে, আজ মাঠের লড়াইয়ে তার প্রতিফলন ঘটবে বলে প্রত্যাশা।
আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল ভেন্যু কিংস অ্যারেনা এবং আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটের আলোয় এবার মুখোমুখি হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দলগুলো। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ফুটবল ও ক্রিকেট—দুই বিভাগেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য লড়বে অংশগ্রহণকারী দলগুলো। দুটি প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩০ লাখ টাকার প্রাইজমানি থাকলেও এর বাইরেও শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অনুষদ সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এই আয়োজনের গুরুত্ব অনেক বেশি। আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামোয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলার সুযোগ, নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরা এবং বৃহত্তর ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সুযোগই তাদের কাছে বড় প্রাপ্তি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে—এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ মাঠে নামার আগেই তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও টুর্নামেন্ট ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ প্রমাণ করে, উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করা গেলে তরুণদের ক্রীড়াচর্চায় যুক্ত করা সম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের কতটি বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে? শুধু খেলোয়াড় ভর্তি করানো কিংবা ক্রীড়াপ্রেমী শিক্ষার্থী থাকা যথেষ্ট নয়; তাদের নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। খেলার মাঠ, প্রশিক্ষণ এবং মানসম্মত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা না থাকলে শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াপ্রতিভা বিকশিত হবে কীভাবে?
এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল ও ক্রিকেট দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্কের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়া। প্রতিযোগিতার মাঠে প্রত্যেক দল নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করবে, কিন্তু মাঠের বাইরের এই আয়োজন তাদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়, বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের বন্ধনও দৃঢ় করবে। আমার বিবেচনায়, ট্রফি জয়ের পাশাপাশি এই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের বিকাশই হবে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় অর্জন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। নারীদের জন্য ফুটসাল প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াচর্চার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিযোগিতার পরিসর যত বাড়বে, ততই নতুন প্রতিভা আবিষ্কার এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে। একটি টুর্নামেন্ট থেকে শুরু হয়ে এমন আয়োজন ভবিষ্যতে বৃহত্তর বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া উৎসবে রূপ নিতে পারে।
আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ (এবিজি) এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশে অংশীদার হতে চায়। খেলাধুলা শুধু বিনোদন কিংবা অবসর কাটানোর মাধ্যম নয়; এটি তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত মনোভাব ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। একই সঙ্গে তরুণদের সুপ্ত প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোরও কার্যকর মাধ্যম। এই উপলব্ধি থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্রীড়াচর্চার প্রসার এবং এর মানোন্নয়নে এবিজি গ্রুপের এমন উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তারুণ্য। তরুণদের শক্তি, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে জাতীয় উন্নয়নও নতুন গতি পেতে পারে। এবিজি চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরের তরুণদের নিয়ে ভাবনা এবং ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবে এবিজি স্পোর্টস সিটির কার্যক্রমকে বিবেচনা করা যায়। আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেখানে নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও আয়োজনের সুযোগ তৈরি করা গেলে তরুণদের খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়বে।
সম্প্রতি কার্তিকের শেষ বিকেলে আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের বাইরে গাড়ির অপেক্ষায় থাকার সময় কয়েকজন তরুণ-তরুণীর কথোপকথন শুনেছিলাম। তাঁদের আলোচনায় উঠে এসেছিল দেশের ক্রীড়াকাঠামোর পরিবর্তন, খেলাধুলা নিয়ে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ এবং আধুনিক ক্রীড়া সুবিধার প্রয়োজনীয়তা। তাঁদের কথায় মনে হয়েছে, একসময় যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা কল্পনার বিষয় ছিল, সেগুলোর কিছু এখন বাস্তবে দৃশ্যমান। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা এবিজি স্পোর্টস সিটি অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের একটি বড় অংশের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
আধুনিক ও সমন্বিত ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবিজি স্পোর্টস সিটির উদ্যোগ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যু ও সুযোগ-সুবিধাকে নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দেশের খেলাধুলার পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বেসরকারি খাতে ক্রীড়া অবকাঠামোয় বিনিয়োগ যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, এই উদ্যোগ তার একটি উদাহরণ। দেশের অন্যান্য উদ্যোক্তা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের কার্যক্রমে এগিয়ে এলে ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এবিজি স্পোর্টস সিটির জুলকান ইনডোর অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত ‘ক্যাপ্টেনস মিট’ এবং এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের জার্সি উন্মোচনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন মূল বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খেলোয়াড় ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রতিযোগিতার মাঠে দলগুলোর লড়াই যত প্রাণবন্ত হবে, ততই বাড়বে দর্শকদের আগ্রহ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্রীড়াচর্চার গ্রহণযোগ্যতা। এমন উদ্যোগের ধারাবাহিকতা আয়োজকদের আরও বড় পরিসরে প্রতিযোগিতা আয়োজনের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এবিজি স্পোর্টস সিটির পরিচালক মো. ইমরুল হাসানও এই আয়োজনকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ক্রীড়াচর্চা সমৃদ্ধ করা এবং নতুন প্রতিভা তুলে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই মঞ্চ থেকে উঠে আসা তরুণেরা ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তিনি আয়োজনটিকে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং তারুণ্য, স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মিলনমেলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এবিজি চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরের আগ্রহ ও দিকনির্দেশনায় এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ২৩ অক্টোবর ২০২৬)
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অতীতে জাতীয় দল, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ফুটবলারদের অংশ নিতে দেখা গেছে। তাঁদের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতার মান ও দর্শক আগ্রহ বেড়েছে। এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপেও বিভিন্ন ক্লাব ও জাতীয় পর্যায়ে খেলা ফুটবলারদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে প্রতিটি ম্যাচ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে ক্রিকেটেও দক্ষ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের উপস্থিতি প্রতিযোগিতার মান বাড়াবে। তবে প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের জন্য নিয়মিত খেলার সুযোগ তৈরি করা এবং তাদের মধ্য থেকে ভবিষ্যতের প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করা।
সব মিলিয়ে, এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ ২০২৬ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খেলাধুলার প্রসার, প্রতিভা অন্বেষণ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। প্রথম আয়োজন সফল হলে এটি প্রতিবছর আরও বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হতে পারে। অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বে, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে এবং নতুন খেলোয়াড় উঠে আসার পথ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়।
তারুণ্যকে কেবল ভবিষ্যতের সম্পদ হিসেবে দেখলেই চলবে না; বর্তমানেই তাদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। সেই সুযোগ তৈরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া সংগঠন, উদ্যোক্তা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ সেই যৌথ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। ট্রফি কার হাতে উঠবে, তা নির্ধারিত হবে মাঠের লড়াইয়ে; কিন্তু প্রতিযোগিতা যদি নতুন বন্ধুত্ব, সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্রীড়ামুখী প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারে, তবে তার সাফল্য কোনো একটি দলের শিরোপা জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।





