আজকের চাঁপাই | আপডেট: 1:55 PM, September 14, 2026
কোটি টাকার স্বর্ণ ছিনতাই করে দুই স্বর্ণকারকে ফোন দেন পুলিশ সদস্য জাকির
ব্যবসায়ীর কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ ছিনতাই করেই পরদিন ভোরে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে যান কনস্টেবল জাকির হোসেন। সেখানে গিয়েই তিনি এলাকার স্বর্ণকারদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। এর আগে কর্মস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রওনা হওয়ার সময় চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা ফোনালাপ করেন। ভোরে গ্রামে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার কর্মস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশে ফিরে যান।
কনস্টেবল জাকিরের ফোনকলের তথ্য ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে তার গতিবিধির এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার পরদিনই ভোরে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া এবং সেখানে পৌঁছেই স্থানীয় দুইজন স্বর্ণকারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
অভিযোগ মতে, গত ৮ আগস্ট বিকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মরাপাগলা নদীর কালীনগর ব্রিজ এলাকায় এক বাহকের কাছ থেকে ৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ওই ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজ ও ফোনের কল রেকর্ডে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশে কর্মরত কনস্টেবল জাকির হোসেনকে ছিনতাই কাজে জড়িত বলে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার সময় কনস্টেবল জাকিরের মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা অপর ব্যক্তি তার বন্ধু মামুন রেজাকে শনাক্ত করেছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, পুলিশ পরিচয়ে অভিযান চালানোর নামে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগে কনস্টেবল জাকির, আপন ভগিনীপতি মোহাম্মদ আলী ও ভাগ্নে নয়নসহ চারজনের বিরুদ্ধে গত ১২ সেপ্টেম্বর সদর মডেল থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন রাজশাহীর স্বর্ণ ব্যবসায়ী নিঝুম। এরপর কনস্টেবল জাকির ও মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করা হয়।
জানা গেছে, কনস্টেবল জাকিরের মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা আসামির নাম মামুন রেজা। তিনি নির্মাণ শ্রমিক। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। স্বর্ণ ছিনতাইয়ের সময় মামুন রেজাও উপস্থিত ছিলেন বলে ফোনকল রেকর্ডে শনাক্ত হয়েছে। তবে মামুন রেজা জানান- তিনি কনস্টেবল জাকিরের সঙ্গে নদীর পাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত নন।
এদিকে স্বর্ণ ছিনতাই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বর্ণ ছিনতাই ঘটনার সঙ্গে কনস্টেবল জাকিরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফোনকল বিশ্লেষণে তারা আরও দেখেছেন- ঘটনার দিন ৮ আগস্ট রাত ২টা ২ মিনিট থেকে ২টা ৪৪ মিনিটের মধ্যে তার চাচাতো ভাই মশিউর রহমানকে ছয়বার ফোন করেন জাকির। সব মিলিয়ে তাদের মধ্যে ২৮ মিনিট কথা হয়। ওই সময় কথা বলতে বলতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে রাজশাহীর গ্রামের বাড়ি দুর্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হন জাকির।
অন্যদিকে ৯ আগস্ট ভোরের দিকে দুর্গাপুরের শ্যামপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার পর সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে তার অবস্থান ছিল পার্শ্ববর্তী আলীপুর গ্রামে। এর কিছুক্ষণ পর সকাল ৮টা ২০ মিনিটে পাচুবাড়ি এবং ৮টা ৪২ মিনিটে বাগমারার গঙ্গানারায়ণপুর গ্রামে তার অবস্থান শনাক্ত হয়। পরে মোহনপুরের বাকশিমুইল ও সইপাড়া হয়ে তানোর উপজেলা সদরের দিকে যান। এরপর তানোর- মুণ্ডুমালা-আমনূরা সড়ক হয়ে সকাল ১০টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফেরেন।
এদিকে একই দিন স্থানীয় দুই স্বর্ণকারের সঙ্গে তার ফোনে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে দুর্গাপুরের শ্যামপুর বাজারের জননী জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী মনির হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন জাকির। একই এলাকার আরেক স্বর্ণকার মো. গাজীকেও একাধিকবার ফোন করেন তিনি।
ফোনকলের তথ্য অনুযায়ী, ৯ আগস্ট সকাল ৮টায় জাকিরের সঙ্গে গাজীর ৬৪ সেকেন্ড কথা হয়। এরপর সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে ৯২ সেকেন্ড, বিকাল ৩টা ৪৩ মিনিটে ১৪৪ সেকেন্ড এবং বিকাল ৩টা ৪৬ মিনিটে ৬৬৬ সেকেন্ড কথা হয় তাদের মধ্যে।
তবে কনস্টেবল জাকিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন দুর্গাপুরের ওই দুই স্বর্ণকার।
স্বর্ণকার মনির হোসেন বলেন, জাকিরের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি তার মনে পড়ছে না।
অন্যদিকে স্বর্ণকার গাজী বলেন, গত চার মাসের মধ্যে জাকিরের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। গত ৯ আগস্ট তাদের মধ্যে কথা হওয়ার নির্দিষ্ট সময় জানানো হলেও তিনি তা অস্বীকার করেন।
এদিকে একই দিন রাতে চাচাতো ভাই মশিউরের সঙ্গে ছয়বার ফোনালাপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাকির তাকে ছয়বার ফোন করার কারণ জানতে চাইলে চাচাতো ভাই মশিউর বলেন, জাকির তাকে প্রায়ই ফোন করেন। যখন সময় পান আমার স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন তিনি।
মশিউর আরও জানান, কারাগারে যাওয়ার পরও সোমবার সকালে জাকির তাকে ফোন করেছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাকির ফোনে কথা বলেছেন। নতুন বন্দি কারাগারে এলে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানোর জন্য তাকে ফোন করার সুযোগ দেওয়া হয়। বন্দি নিজেই ঠিক করেন, কোন নম্বরে ফোন করবেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, স্বর্ণ ছিনতাইয়ের পর জাকির কার কার সঙ্গে কথা বলেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা তা বিশ্লেষণ করছেন। ঘটনার সঙ্গে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাকেই গ্রেফতার করা হবে।
তিনি বলেন, স্বর্ণ ছিনতাইয়ের মামলায় জাকিরের বন্ধু মামুন রেজাও এজাহারভুক্ত আসামি। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। মোহাম্মদ আলীর ছেলে নয়নকেও খুঁজছে পুলিশ।
রাজশাহী থেকে নিঝুম নামের এক ব্যবসায়ী ওই ৪০ ভরি স্বর্ণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেক ব্যবসায়ীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। স্বর্ণ নিয়ে সেখানে যান নিঝুমের ভগিনীপতি মোহাম্মদ আলী। স্বর্ণ হস্তান্তরের সময় সাদাপোশাকে থাকা কনস্টেবল জাকির ও তার বন্ধু মামুন পুলিশ পরিচয়ে স্বর্ণগুলো ছিনতাই করেন। এ ঘটনায় স্বর্ণের বাহক মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে নয়নের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলীকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চকআলমপুর গ্রাম থেকে গ্রেফতার ও তার বাড়ি থেকে ছিনতাই হওয়া ২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কনস্টেবল জাকিরকেও গ্রেফতার করা হয়। সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। মঙ্গলবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি আদালতে তাদের রিমান্ড শুনানির কথা রয়েছে।
এদিকে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোহাম্মদ আলী স্বীকার করেছেন পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তিনি ও তার ছেলে নয়ন কনস্টেবল জাকিরকে দিয়ে স্বর্ণগুলো ছিনতাই করান। এরপর আধাআধি হিসেবে ভাগ করা হয়। ৪০ ভরির মধ্যে কনস্টেবল জাকির ২০ ভরি নেন এবং বাকি ২০ ভরি তাকে দেন।
জানা গেছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর থানায় মামলা হওয়ার পর কনস্টেবল জাকির ও বাহক মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।






